| | শনিবার, ১২ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২১শে রবিউস সানি, ১৪৪৩ হিজরি |

পাটের বাজার ফের মন্দা

প্রকাশিতঃ ১১:৫৫ পূর্বাহ্ণ | অক্টোবর ৩১, ২০২১

somoy news

সময় নিউজ ডেস্ক :দেশে-বিদেশে পাটের বহুমুখী ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় দুই বছর পাটের রমরমা ব্যবসা হয়েছে। গত বছর অক্টোবর মাসে পাটের মণপ্রতি দাম উঠেছিল সাত হাজার টাকা। চলতি বছরের অক্টোবরের শেষে সেই ভালোমানের পাট বিক্রি হচ্ছে মাত্র দুই হাজার ৮শ’ টাকায়। তবু হাটে পাটের ক্রেতা নেই। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে মণপ্রতি দাম কমেছে প্রায় চার হাজার টাকা। পাটচাষী ও ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা গতবারের মতো এবারও বেশি দামের আশায় পাট মজুত করেন। পাটের মন্দা বাজারে তাদের মাথায় হাত পড়েছে।

বিশ্ববাজারে পাট পণ্যের মূল্য বৃদ্ধিতে সোনালি আঁশে আবার সোনালি স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন কৃষক, ব্যবসায়ী ও পাটকল মালিকরা। মহামারি করোনায় চলতি বছর আবার পাটের বাজার মন্দা হয়েছে। এরমধ্যে সরকারি ২৫টি পাটকল বন্ধ থাকায় পাটচাষী ও ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা পথে বসেছেন। পাট এখন তাদের কাছে গলার ফাঁসে পরিণত হয়েছে।

ফরিদপুরের তালমা হাটে সোমবার পাট নিয়ে এসেছেন কৃষক আবুল হাশেম। তিনি জানান, গত বছর সাত হাজার টাকা মণে পাট বিক্রি করেছেন। ভালো দামের আশায় তিনি এবার বেশি জমিতে পাট চাষ করেন। মৌসুমে সাড়ে তিন হাজার টাকা মণে পাট বিক্রি না করে মজুত রাখেন। ভেবে ছিলেন এবার বাজারে পাটের দাম আট হাজার ছাড়াবে। কিন্তু এখন তিনি হতাশ। ভালোমানের শুকনো পাট তিনি ২ হাজার ৮০০ টাকা মণে বিক্রি করেছেন। এতে তার লোকসান হবে বলে জানান তিনি।

নারায়ণগঞ্জের বড় পাট ব্যবসায়ী শুভেন্দু গোস্বামী যায়যায়দিনকে বলেন, গত একমাস ধরে ফরিদপুরের পুকুরিয়া, কানাইপুর, মধুখালী, খামারখালী ও ঢাকার আড়াইহাজারে সর্বোচ্চ ২৮শ’ টাকা মণ দরে পাট বিক্রি হয়েছে। রাজবাড়ীর

বহরপুর, কনকাপুর, পাংশার হাটগুলোতে আড়াই হাজার টাকা মণে পাট বিক্রি হচ্ছে। মাগুরার সত্যজিৎপুর, লাঙ্গলবাদ, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, শাহজাদপুর, ময়মনসিংহ, গৌরীপুর, ইশ্বরগঞ্জ, জামালপুর, সরিষাবাড়িতে পাটের দামে নাখোশ কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। এসব অঞ্চলের কৃষকরা বলছেন, এবার কৃষকের সঙ্গে পাট ব্যবসায়ী ও ফড়িয়ারা লোকসানে পড়েছে। সরকারি মিলগুলো হঠাৎ বন্ধ করায় পাটের বাজারে এই দশা হয়েছে।

রপ্তানি উন্নয়ন বু্যরোর (ইপিবি) তথ্য অনুসারে, ২০২০-২১ অর্থবছরে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি থেকে রেকর্ড ১ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার আয় করে বাংলাদেশ। অথচ চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে পাটকল মালিকরা ২৫৬ মিলিয়ন ডলারের পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করেছেন। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় যা প্রায় ৩৭ শতাংশ কম। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন পাটের আঁশ ও সুতা প্রস্তুতকারকরা। কারণ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তাদের রপ্তানি আয় প্রায় ১৩০ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। গত বছরের তুলনায় যা ৪০ শতাংশ কম। শীতপ্রধান দেশগুলোতে প্রায় ৫০ ধরনের পাটের কাপড় রপ্তানি হয়। কিন্তু এবার সে সব দেশ থেকে অর্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। এমন অবস্থায় দেশের ছোট ছোট পাটকলগুলো বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএমএ) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান পাটোয়ারী যায়যায়দিনকে বলেন, বিশ্ববাজারে হঠাৎ পাটের দরপতনে আমরা হতাশ হয়ে পড়েছি। পরিবেশ বান্ধব পাটের ক্রেতারা হঠাৎ মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। নতুন কার্যাদেশ পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি থেকে মোট আয়ের দুই-তৃতীয়াংশই আসে পাট থেকে তৈরি সুতা রপ্তানির মাধ্যমে। পাটের সুতা দিয়ে শাড়ি ছাড়াও তৈরি হচ্ছে পাঞ্জাবির কাপড়, টুপি, জিন্স ও গরম কাপড়। উড়োজাহাজের ইন্টেরিয়রও তৈরি হচ্ছে পাটের সুতা দিয়ে। তুরস্কসহ ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কার্পেট প্রস্তুতকারকরা বাংলাদেশের পাটের সুতার প্রধান ক্রেতা। মহামারি করোনার কারণে তারা শৌখিন পণ্য বাদ দিয়েছেন। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে পাট বা পাটপণ্য রপ্তানিতে সুফল পাওয়া যাবে না।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র পাট ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশিদ যায়যায়দিনকে বলেন, মৌসুমের শুরুতে আমরা তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা মণে পাট কিনে মজুত করেছি। প্রায় তিন মাস ধরে দেশের বাজারে পাটের দাম কমতে শুরু করে। এখন ঋণ করে পাট কিনে মজুত করায় বড় লোকসানের মধ্যে পড়েছি। অন্যদিকে বিজেএমসির কাছে ক্ষুদ্র পাট চাষিদের পাওনা দাঁড়িয়েছে ২৪৩ কোটি টাকা। আমরা এখন পাট দিয়ে কি করবো ভেবে পাচ্ছি না। আন্তর্জাতিক বাজারে দরপতনের কারণে ছোট পাটকলগুলো পাট কিনছে না। অন্যদিকে সরকারি পাটকলগুলো বন্ধ। তিনি আরও বলেন, পাটশিল্পকে বাঁচাতে সরকারি পাটকলগুলো দ্রম্নত চালু করা দরকার।

কার্বন ফ্যাক্টরি মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ চারকোল (পাটকাঠির কালি) ম্যানুফ্যাকচার্স অ্যান্ড এক্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, ২০২০-২০২১ অর্থবছরে চারকোল রপ্তানি হয় চার হাজার ১৮২ দশমিক ২৭ টন। প্রতি টন চারকোলের মূল্য ছিল ৭০০ ডলার। এ হিসাবে চারকোল থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আসে ২৯ লাখ ২৭ হাজার ৫৮৯ ডলার বা প্রায় ২৫ কোটি টাকা। ২০২১-২০২২ সালে এ খাত মুখ থুবড়ে পড়ায় রপ্তানিতে ধস নেমেছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে জানা যায়, এবার সারাদেশে পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে আট লাখ ৫৭ হাজার হেক্টর জমিতে ৯০ লাখ বেল পাট উৎপাদনের টার্গেট। গত বছর সারাদেশে পাটের আবাদ হয় ৬ লাখ ৬৬ হাজার হেক্টর জমিতে। বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ২০০২ সালে পলিথিন ব্যাগের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। কিন্তু বাজার থেকে পলিথিনের ব্যবহার কমেনি। এরপর সরকার ২০১০ সালে আরেকটি আইন করে। পলিথিনের বদলে পাটের ব্যবহারের জন্য জারি করা হয় ‘পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন-২০১০’। কিন্তু আইনের প্রয়োগ না থাকার পুরোপুরি সুফল মিলেনি।

Matched Content

সময় নিউজ ডট নেট এর কোনো সংবাদ,তথ্য,ছবি,আলোকচত্রি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে র্পূব অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা সর্ম্পূণ বেআইনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে কোন কমেন্সের জন্য কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।


Shares